June 7, 2026, 11:40 pm

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন পোর্টাল
সংবাদ শিরোনাম :
বাজারের আগুন, মধ্যবিত্তের দীর্ঘশ্বাস/ সরকার কি পরিস্থিতির গভীরতা বুঝতে পারছে? তিন বগি লাইনচ্যুত, খুলনার সঙ্গে উত্তরবঙ্গের রেলযোগাযোগ বন্ধ রামিসা হত্যা মামলায় সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কুষ্টিয়ায় জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতা-২০২৬ অনুষ্ঠিত ব্যবধান আড়াই মাস/ পদ্মায় দুই ফেরিঘাট দুর্ঘটনা: একটিতে মৃত্যু, আরেকটিতে রক্ষা—কেন বারবার ঘটছে একই ঘটনা? দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে ফের দুর্ঘটনা/ কুষ্টিয়ার যাত্রীবিহীন এসবি পরিবহন নদীতে, বড় ধরনের প্রাণহানি এড়াল মেহেরপুর-কুষ্টিয়া মহাসড়কে ট্রাক-ইজিবাইক সংঘর্ষ: চালকসহ দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু, আহত ২ সংস্কার নয়, মূল্যবৃদ্ধির পুরনো পথেই নতুন সরকার ১২ মামলায় জামিন, কারামুক্ত ডা. আইভী, সরকারকে ধন্যবাদ, লড়তে চান সিটি নির্বাচনে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের নিয়োগ নিয়ে ভাইরাল অডিও, তদন্তের দাবি

বাজারের আগুন, মধ্যবিত্তের দীর্ঘশ্বাস/ সরকার কি পরিস্থিতির গভীরতা বুঝতে পারছে?

ড. আমানুর আমানের কলাম

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে দীর্ঘদিন ধরে স্থিতিশীলতার প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই শ্রেণিই নিয়মিত আয় করে, কর দেয়, সন্তানদের শিক্ষায় বিনিয়োগ করে, ব্যাংকে সঞ্চয় রাখে, আবাসন খাতে ব্যয় করে এবং ভোক্তা বাজারকে সচল রাখে। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং স্থবির আয়ের কারণে এই মধ্যবিত্ত শ্রেণিই সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—অর্থনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ যখন নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে, তখন সরকার কি পরিস্থিতির প্রকৃত গভীরতা উপলব্ধি করতে পারছে?
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত মোহাম্মদপুরের বছিলার বাসিন্দা নুর আলমের গল্প আসলে লাখো মধ্যবিত্ত পরিবারের গল্প। মাসে ৪৫ হাজার টাকা আয় করেও তিনি পরিবারের চার সদস্যের ভরণপোষণ, বাসাভাড়া, সন্তানের শিক্ষা এবং চিকিৎসা ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। কয়েক বছর ধরে কোনো বেতন বৃদ্ধি হয়নি, অথচ নিত্যপণ্যের দাম একের পর এক বেড়েছে। বাধ্য হয়ে তিনি সঞ্চয় ভেঙেছেন, খাদ্যতালিকা থেকে মাছ, ফল, এমনকি দুধও বাদ দিয়েছেন। এ দৃশ্য এখন আর ব্যতিক্রম নয়; বরং নগর ও মফস্বলের মধ্যবিত্ত জীবনের নতুন বাস্তবতা।
নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বাজার নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু শতদিন পার হওয়ার পরও বাজারে তার প্রতিফলন স্পষ্ট নয়। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, মূল্যস্ফীতি এখনও ৯ শতাংশের আশপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে। বাস্তবে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা বলছে, অনেক ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির প্রভাব সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি। কারণ মানুষের আয় বাড়েনি, কিন্তু প্রতিদিনের ব্যয় বেড়েছে।
এরই মধ্যে জ্বালানি তেল, এলপিজি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অর্থনীতির মৌলিক নিয়ম অনুযায়ী, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন, পরিবহন ও বিপণন খরচ বাড়ায়। ফলে প্রায় সব ধরনের পণ্য ও সেবার দাম বাড়ে। বিদ্যুতের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধিও সেই একই চক্রকে আরও ত্বরান্বিত করবে। সরকার হয়তো মনে করছে, এই মূল্যসমন্বয় আর্থিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয়; কিন্তু সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি নতুন করে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। যদি সরকার সত্যিই অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে কেন ধারাবাহিকভাবে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হচ্ছে? কেন বাজারে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান সাফল্য পাওয়া যাচ্ছে না? কেন মূল্যস্ফীতি এখনও উচ্চ অবস্থানে রয়েছে?
আরও বড় প্রশ্ন হলো—সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল বা বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের বিষয়টি কেন বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে?
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শুধু প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ নন; তারা একটি বড় ভোক্তা গোষ্ঠীও। দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা শহরে স্থানীয় অর্থনীতির একটি বড় অংশ তাদের ক্রয়ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। বেতন বৃদ্ধি হলে তারা বাসা নির্মাণ করেন, আসবাবপত্র কেনেন, বাজারে বেশি ব্যয় করেন, সন্তানদের শিক্ষায় বিনিয়োগ করেন এবং স্থানীয় ব্যবসাকে সচল রাখেন। অর্থনীতির ভাষায় এটি ‘ডিমান্ড সাপোর্ট’ হিসেবে কাজ করে।
কিন্তু যখন সরকার নিজেই নতুন পে-স্কেল কার্যকর করতে পারছে না কিংবা এ বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে পারছে না, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা কি প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল? রাজস্ব আহরণ কি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী হচ্ছে না? নাকি ব্যয়ভার এতটাই বেড়েছে যে সরকার নতুন আর্থিক প্রতিশ্রুতি দিতে দ্বিধায় রয়েছে?
অবশ্যই একটি নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন বিশাল আর্থিক দায় তৈরি করে। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে দীর্ঘদিন বেতন সমন্বয় না হলে সরকারি কর্মচারীদের প্রকৃত আয় কমে যায়, যার প্রভাব বাজারেও পড়ে। যে শ্রেণি একসময় মাসের শুরুতে বড় কেনাকাটা করে বাজারে চাহিদা সৃষ্টি করত, তারা যদি ব্যয় সংকোচন শুরু করে, তবে অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ গতি আরও দুর্বল হতে পারে।
বাজার নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযান কিংবা ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরিমানা সংবাদ শিরোনাম তৈরি করলেও বাজারে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে পারেনি। কারণ সমস্যার মূল শিকড় রয়েছে সরবরাহ ব্যবস্থার অদক্ষতা, মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব, আমদানি বাণিজ্যের কেন্দ্রীভবন এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সিন্ডিকেটে।
সাধারণ মানুষ এখন দেখতে চায়, সরকার খুচরা দোকানদার নয়, বরং পাইকারি বাজার ও বড় আমদানিকারকদের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে। কারণ বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হলে তার বোঝা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ঘাড়েই পড়ে।
এ অবস্থায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো মধ্যবিত্তের সঞ্চয় ভেঙে বেঁচে থাকার প্রবণতা। কোনো পরিবার যখন নিয়মিত ব্যয় মেটাতে ডিপিএস ভাঙে, চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে ঋণ নেয় বা খাদ্যতালিকা সংকুচিত করে, তখন তা শুধু একটি পরিবারের সংকট নয়; এটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক দুর্বলতার ইঙ্গিত। কারণ সঞ্চয় কমে গেলে বিনিয়োগ কমে, ভোগ কমে গেলে ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও চাপের মুখে পড়ে।
সরকারের সামনে তাই এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ। একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, অন্যদিকে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে হবে। শুধু সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ কিংবা ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। প্রয়োজন বাজার ব্যবস্থার গভীরে থাকা অসঙ্গতিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ এবং অর্থনৈতিক নীতিতে স্বচ্ছতা।
বাংলাদেশের মানুষ অতীতে বহু সংকট মোকাবিলা করেছে। কিন্তু বর্তমান সংকটের বিশেষত্ব হলো—এটি একই সঙ্গে বাজার, আয়, সঞ্চয় এবং আস্থার সংকট। মানুষ শুধু বেশি দাম দিচ্ছে না; তারা ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তায় ভুগছে।
সরকার যদি দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান সাফল্য দেখাতে না পারে, যদি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসে এবং যদি রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর না মেলে, তাহলে মধ্যবিত্তের এই দীর্ঘশ্বাস আরও গভীর হবে। আর কোনো দেশের মধ্যবিত্ত যখন ধারাবাহিকভাবে দুর্বল হতে থাকে, তখন তার প্রভাব শুধু পরিবারে নয়, পুরো অর্থনীতিতেই পড়ে।

ড. আমানুর আমান, সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইমস

নিউজটি শেয়ার করুন..

Comments are closed.

পুরোনো খবর এখানে,তারিখ অনুযায়ী

MonTueWedThuFriSatSun
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930 
© All rights reserved © 2024 dainikkushtia.net
Maintenance By DainikKushtia.net